0

ইস্টার দ্বীপের ( রাপা নুই) বিশালাকার মোয়াই মূর্তিগুলো নিয়ে মানুষের জল্পনাকল্পনার শেষ নেই, বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন এলাকা- প্রশান্ত মহাসাগরের এক রত্তি দ্বীপটিতে কি করে এমন শত শত মূর্তি ( ৮৮৭ টি) নির্মাণ করা সম্ভব হল এবং সেগুলো পরিবহণ করা হয়েছিল তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা খুঁজে ফিরেছে বিজ্ঞানীদের দল দশকের পর দশক, অবশেষে এত বছরের নিবিড় গবেষণার ফলে প্রাপ্ত অনেক ফলাফলের মাঝে একটি হয়ত জানাচ্ছে আমাদের সেই রহস্যের চাবিকাঠি!
১৭২২ সালের ইস্টার সানডে তে ইউরোপিয়ান নাবিকরা এই ক্ষুদে দ্বীপটা আবিস্কার করার পরে দানব মূর্তি গুলো দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন করেছিল- এই মূর্তিগুলো কি করে তাদের বর্তমান জায়গায় আসল? উত্তর এসেছিল- নিজেরাই হেঁটে হেঁটে! প্রায় ৩০০ বছর পার হয়ে গেলেও সেই প্রশ্নের শতভাগ গ্রহণযোগ্য উত্তর আমাদের মিলে নি, এখনো ইস্টার দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের বংশধরদের প্রশ্ন করলে একই উত্তর মিলে- তারা আপনা থেকেই হেঁটে হেঁটে এসেছে!
এই নিয়ে এসেছে অনেক মতবাদ, হাজারো ব্যাখ্যা- এরিক ফন দানিকেনের ভিনগ্রহের আগন্তক ব্যাখ্যা থেকে থর হেয়ারডালের ল্যাতিন আমেরিকান অভিবাসী হয়ে পলিনেশিয়ান কারিগর- কিছুই বাদ নেই বলা চলে ( ভাগ্যিস গ্যাভিন মেনজিস বলে নি মূর্তিগুলো চাইনিজদের তৈরি!) কিন্তু আসল সত্য কোনটি যার সন্ধানে লেখা হয়েছে শত শত বই, তৈরি হয়েছে একের পর এক তথ্যচিত্র, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের পত্রিকায় যে কতবার এসেছে ইস্টার আইল্যান্ড টা মনে হয় সম্পাদক সাহেবেরও খেয়াল নেই, নির্মিত হয়েছে হলিউডের চলচ্চিত্র। এই ভাবেই সারা বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় এবং সেই সাথে ভ্রমণার্থীদের কাছে আরাধ্য গন্তব্য হয়ে উঠেছে এই ক্ষুদে আগ্নেয় দ্বীপ।
এখন পর্যন্ত ইস্টার আইল্যান্ড নিয়ে নির্মিত প্রায় সবগুলো তথ্যচিত্রই দেখা হয়েছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ( কারণ আর কিছুই নয়, অন্য অনেকের মতই আমাকে যদি সুযোগ দেওয়া হয় একটি মাত্র জায়গা দেখার, স্কুল জীবন থেকেই সেই জায়গাটি ইস্টার দ্বীপের জন্য বরাদ্দ) এবং এখন পর্যন্ত রহস্যঘেরা এই দ্বীপ নিয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সেরা তথ্য চিত্রটি নির্মাণ করেছেন প্রিয় মুখ ডেভিড অ্যাটেনবোরো, যার নাম Lost Gods of Easter Island, সেখানে যদিও ডেভিড এই দ্বীপের আদি অধিবাসীদের তৈরি কাঠের দেবতা মূর্তি নিয়ে আলোকপাত করেছেন কিন্তু সেই ফাঁকেই জানিয়ে দিয়েছেন মোয়াই গড়ার কারণ, অধিবাসীদের সংস্কৃতি, ফিগ্রেট পাখির অনুকরণে পাখিমানব উৎসবের কথা ইত্যাদি।
আর বাকী তথ্যচিত্রগুলোতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই রহস্য ঘনীভূত করার চেষ্টা, আসলে কারা ছিল সেই মোয়াই নির্মাতারা টা নিয়ে বৃথা জল ঘোলা করা, আর সব শেষে খানিকটা রহস্য রেখে দেওয়া ইচ্ছে করেই, মনে হয় এমনটা না করলে দর্শক এগুলো খায় না!
সেই সাথে শত শত বইয়ের মাঝে বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছিল কনটিকি অভিযানের জনক থর হেয়ারডালের The Art of Easter Island বইখানা, পেল্লাই সাইজের,এ-৪ পাতার সংখ্যা ৫৫০! যদিও সেটি ভর্তি ছিল ইস্টার দ্বীপের আদিবাসীদের তৈরি নানা শিল্পকর্মে, মূলত ভাস্কর্যের আলোকচিত্রে। এছাড়া রয়েছে তার বিখ্যাত বই আকু-আকু।
যাই হোক, নানা ধরনের গবেষণা চালিয়ে ( ভাষাগত, প্রত্নতত্ত্ব, জেনেটিক্স- ডি এন এ ম্যাপিং) শত ভাগ নিশ্চিত হয়েছেন মোয়াই নির্মাতারা পলিনেশীয়, অন্য দ্বীপ থেকে তারা সাগর পাড়ি দিয়ে ইস্টার দ্বীপে এসেছিল, ল্যাতিন আমেরিকা থেকে নয়, তাদের সাথে ইনকাদের কোন সম্পর্ক নেই।
সেই সাথে এটুকুও তারা প্রমানে সক্ষম হয়েছেন যে সেই প্রাগৈতিহাসিক আমলে ব্যবহৃত যন্ত্র দিয়েই দ্বীপের অধিবাসীরা আস্ত পাথরের চাই কেটে মোয়াই তৈরি করতে পারত, কিন্তু তাতে কেবল দরকার ছিল ব্যপক জনশক্তির এবং অঢেল সময়ের।
সেই সাথে প্রমানে সক্ষম হয়েছেন এক সময়ে মিলিয়ন মিলিয়ন পাম জাতীয় গাছে আচ্ছাদিত ছিল সারা দ্বীপ কিন্তু মানুষের প্রথম আবির্ভাবে পর থেকে বৃক্ষশূন্য হতে হতে বিরান তৃণভূমিতে রূপান্তরিত হয় সমস্ত এলাকা, এর কারণে হিসেবে এত দিন কিন্তু দায়ী করা হত সেই মোয়াই মূর্তিগুলোকেই, ধারণা করা হত মূর্তিগুলো পরিবহনের কাজেই সমস্ত গাছ পর্যায়ক্রমে কর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন মনে করা হচ্ছে দ্বীপটি বৃক্ষশূন্য হবার পিছনে মানুষের চেয়ে অনেক বেশী ভূমিকা মানুষের নৌ যাত্রার সাথী হিসেবেই আসা পলিনেশিয়ান ইঁদুর! এর সর্বভুক প্রাণীগুলো পাম গাছের ফল খেয়ে অতি ধীর গতিতে বাড়া এই গাছের বংশবিস্তার এবং অঙ্কুরোদগমের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ রূপে বিনাশ করে দেয়। ফলশ্রুতিতে অবশ্যম্ভাবী ধীর গতিতে বৃক্ষ শূন্য হতে থাকে ইস্টার দ্বীপ।
সেই সাথে নতুন প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে মনে হয় ইস্টার দ্বীপে প্রথম মানুষ এসেছিল ১২০০ সালে ( আগে মনে করা হত ৮০০ সালে), তার মানে মাত্র পাঁচশ বছরের মাঝে বসতি স্থাপন করা কিছু মানুষ বিশ্বের বিস্ময় মোয়াই গুলো নির্মাণ করে সারা দ্বীপের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপনে সমর্থ হয় ( মনে করা হচ্ছে তাদের আলাদা আলাদা গোত্রের মাঝে বিশাল থেকে বিশালতর মোয়াই তৈরির প্রতিযোগিতা চলছিল, মোয়াইগুলো হয়ত তাদের সর্দার বা কোন দেবতার প্রতিমূর্তি) , এক পর্যায়ে বেঁধে গিয়েছিল গৃহযুদ্ধ, গোত্রে গোত্রে দন্ধের ফলে উল্টে দেয়া হয় বেশ কিছু মূর্তি। এবং থেমে যায় মোয়াই নির্মাণ, ইউরোপিয়ানদের পদার্পণের পরে নতুন করে কোন মূর্তি নির্মিত হয় নি।
১৯৫৫ সালে থর হেয়ারডালের সাথের গবেষকদল ১৩ ফুট লম্বা, ১০ টনের এক মোয়াইকে গাছের গুঁড়ির উপরে শুইয়ে, বেঁধে তা জনবলের সাহায্যে বহনের চেষ্টা করেন। তারা নিজেরা সেই আমলের প্রাচীন প্রযুক্তি ব্যবহার করে খনির শিলা থেকে একটি প্রমাণ আকারের মোয়াই কুঁদে বাহিরও করেন। যদিও জনৈক ইস্টার দ্বীপবাসী থরকে বলেছিলেন- স্যার, আপনি সম্পূর্ণই ভুল পথে চিন্তা করছেন।
১৯৭০ উইলিয়াম মুল্লই দাবী করেন হয়ত তিনকোণা কাঠামো থেকে একটি মোয়াইকে বেঁধে ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে বহন করা হয়েছিল।
১৯৮৬ সালে চেক দেশের প্রকৌশলী পাভেল , থর হেয়ারডালের সাথে যৌথ মিশনে মাত্র ১৭ জন মানুষের সাহায্যে ১৩ ফুট লম্বা, ৯ টন মোয়াই বেশ কিছু দূর বহন করতে সক্ষম হন ডানে- বামে মুচড়ে মুচড়ে ( টুইস্ট), কিন্তু এতে মোয়াইটির গোঁড়ার দিকে ক্ষতি হয়।
১৯৮৭ সালে মার্কিন প্রত্নতত্ত্ববিদ চার্লস লভ গাছের গুঁড়ির রোলার ব্যবহার করে রোলারের উপরে গাছের স্লেজের উপরে মোয়াই স্থাপন করে মাত্র ২ মিনিটে ১৪৮ ফুট বহন করতে সক্ষম হন।
১৯৯৮ সালে জো অ্যানে ভ্যান টিলবুর্গ পলিনেশিয়ানরা যেভাবে বিশালকায় ক্যানু পরিবহণ করত, সেই পদ্ধতি অনুকরণ করে গাছের গুঁড়ির উপরে মোয়াই স্থাপন করে টেনে টেনে পরিবহণ করে দেখান
অবশেষে গত বছর ২০১১ সালে টেরি হান্ট এবং কার্ল লিপো চমকপ্রদ তথ্য প্রমাণ নিয়ে হাজির হন, তারা প্রমাণ করে দেখান যেহেতু মোয়াইগুলো পেট বেশ স্থুল করে তৈরি করে, তাই সেগুলো D –র মত সামনের দিকে ঝুকে থাকে, আর সেগুলো খুব অল্প জন বল নিয়ে তিন দিক থেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে, বিশেষ কায়দায় ভারসাম্য রক্ষা করে খুব সহজেই হেলে-দুলে সামনে দিকে নিচে যাওয়া সম্ভব। এতে পিছন দিক থেকে একটি দল শক্ত করে দড়ি ধরে মোয়াইটি পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে, আপন স্থুল পেটের কারণে মোয়াই এমনিতেই ১৪ ডিগ্রী সামনের দিকে ঝুলে থাকে, তখন দুই দিকে, ডান ও বাম থেকে দুই দল পর্যায়ক্রমে দুলিয়ে দুলিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করে সামনের দিকে এগোতে থাকে, ফলে দেখে মনে হয় মোয়াইগুলো নেচে নেচে বা আপনা থেকেই হেঁটে সামনের দিকে এগোচ্ছে!! এইখানে ভিডিও
তাহলে দ্বীপবাসীরা কি ঠিকই বলেছিল- মোয়াইরা এসেছিল হাঁটতে হাঁটতে!
এইখানে ৫টি পদ্ধতির ভিডিও দেখানো হয়েছে–
টেরি হান্ট এবং কার্ল লিপো আরও বলেছেন তাদের ধারণা ইস্টার বাসীরা নরখাদক ছিল না, এর আগে নরমাংস ভোজনের প্রমাণ হিসেবে দেখানো ধারালো পাথরের অস্ত্রগুলো আসলে ব্যবহৃত হত কৃষিকাজে। সেই সাথে তারা এও দাবী করেন আসলে ইস্টার দ্বীপ ছিল মানুষের প্রাচীনতম Suntainable কৃষিকাজের উদাহরণ। কিন্তু অন্য বিজ্ঞানীরা মনে করেন গৃহযুদ্ধের কারণে তারা স্বজাতির হত্যা করে খাওয়ার রীতি চালু করেছিল। পরবর্তীতে দাস ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে মানুষ পাচার হতে হতে ১৮৭৭ সালে ৬৩ বর্গ মাইলের দ্বীপটির জনসংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১১১ জনে! পরে ১৮৮৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি ( যা কিনা ২১৫০ মাইল দূরে অবস্থিত) এই দ্বীপটি দখল করে নেয়, যদিও ১৯৫৩ সালে পর্যন্ত এটি মূলত একটি স্কটিশ কোম্পানির ভেড়ার খামার হিসেবেই ব্যবহৃত হত। আজ দ্বীপটির মূল উপার্জনের ভিত্তি কিন্তু পর্যটন, এবং তার কেন্দ্রে আছে সেই মোয়াইরা। আর এই দ্বীপে বসবাসকারী ৫০৩৪ জন মানুষ অপেক্ষা করছে স্বায়ত্তশাসনের।
তাহলে কি সমাধান ঘটল সকল রহস্যের? আমরা জানি না এখনো, অনেক দ্বীপবাসীর মতেও কোনদিনই সমস্ত রহস্যের সন্ধান পাওয়া যাবে না, কারণ সব কিছু জানা হয়ে গেলেই মোয়াইদের এবং রাপা নুই-এর জাদু শেষ হয়ে যাবে!
( রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত বই এবং পত্রিকারগুলোর নাম লেখার মধ্যেই আছে, ছবিগুলো নেট থেকে সংগৃহীত। যারা ইস্টার দ্বীপ নিয়ে আরও জানতে ইচ্ছুক তারা হিমু ভাইয়ের এই সিরিজ পড়ে দেখতে পারেন।
আর কয়েক বছরের মধ্যে নিজেই যেতে পারলে মোয়াই আকারের পোস্ট দিব, রাপা নুইয়ের কসম)

YOUR NAMEAbout Me
আসসালামু আলাইকুম। নবীন বাংলা ব্লগ সাইটে ভিজিট করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আসলে এই ব্লগ সাইটটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। এবং আমি এই সাইটের এডমিন, মূলত ব্লগিং প্রাকটিস এবং মুক্ত জ্ঞাণ চর্চার জন্যই এই সাইটটি ওপেন করেছি। আমার সাইটের পোস্টগুলো অন্যান্য সুনাম খ্যাত ব্লগ সাইটে সমূহে পাবলিশ করে থাকি তথারুপ টেকটিউন্স, টিউনারপেইজ। ইনশাআল্লাহ যতদিন বেঁচে থাকব নবীন বাংলা ব্লগে লেখালেখি করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এখানে অন্যান্য লেখকদের বাছাই করা পোস্টগুলো পাবলিশ করা হয়। এবং ইচ্ছা করলে আপনিও এই ব্লগের অতিথি লেখক হিসাবে শুরু করতে পারেন।পরিশেষে আমার সাইট কিংবা প্রকাশিত লেখা সম্পর্কে কোন আপনাদের অভিযোগ, মতামত, পরামর্শ থাকলে তা সাদরে গ্রহন করা হবে। আবারো ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা সবাইকে!!
Follow : | | Facebook | Twitter

Post a Comment

 
Top