0
একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। বড় ভাই ছিল খুব আদরের। বড় ভাইয়ের প্রশংসায় পুরো পরিবার গর্বিত। সে ছিল বিশাল সম্পদ। একদিন কোন এক দূর্যোগে বড় ভাই হারিয়ে গেলে ছোটভাই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। বড় ভাইয়ের আদলে ছোট ভাই যেন নতুন রূপে নিজেকে বিকাশ করেছে । পরিবারে ছোটভাইও হয়েছে প্রশংসিত এবং প্রসিদ্ধ। এই দুই ভাই আর কেউ নয়, আমাদের এই বাংলা পরিবারের অনেক বড় দুটি শিল্প-সম্পদ মসলিন ও জামদানি। কথিত আছে, ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে দেশের শাসনভার চলে যাওয়ায় মসলিন শিল্পের বিলুপ্তি ঘটে। ব্রিটিশরা মসলিন কারিগরদের বৃদ্ধাঙ্গলি কেটে দেওয়ায় এ শিল্প হতে তারা দূরে সরে গিয়ে কৃষিকাজে যুক্ত হয়।
প্রাচীন সভ্যতার যুগে তাঁত বুনন পক্রিয়ায় কার্পাস তুলার সুতা দিয়ে ‘মসলিন’ নামে সুক্ষ্ম বস্ত্র তৈরী হত। এই মসলিন কাপড়ের ওপর যে জ্যামেতিক নকশাদার বা বুটিদান বস্ত্র বোনা হত তার-ই নাম জামদানি। ‘জামদানি’ নামটি এসেছে মূলত জামা অর্থ কাপড় এবং দানি বা দানা অর্থ বুটি থেকে। যার অর্থ দাড়ায় বুটিদার কাপড়।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিশাল বিশাল নৌকা বা বড়জে করে সওদাগররা আমাদের দেশে আসত সওদা করতে।আমাদের বস্ত্র শিল্পের প্রশংসা ছিল পৃথিবীজুরে। প্রাচীন এই গৌরবময় ঐতিহ্য বস্ত্র শিল্পের প্রধান আকর্ষন ছিল মসলিন কাপড়। এই কাপড়টি অনেক প্রাচীন হলেও ‘মসলিন’ নামটি এসেছে অনেক পরে। আগে এটিকে মসৃন নীল বস্ত্র বলা হত। মসলিন গবেষকরা ধারনা করেন ইরানের “মোসুল” বন্দরে বাংলার বস্ত্রের উপস্থিতির
কারনে বাংলার বস্ত্র “মসলিন” আখ্যায়িত করা হয়। মসলিন কাপড় ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। তখনকার রাজা-সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞী তথা রাজ পরিবারের প্রথম পছন্দ ছিল মসলিন কাপড়। নানাজাতের মসলিনের মধ্যে মলমল খাস, মলবুস খাস নামক মসলিন ছিল শ্রেষ্ঠ। “আঁবে-ই-রওয়া” মসলিন-ও ছিল অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। “আঁবে-ই-রওয়া” ফার্সি শব্দ, অর্থ প্রবাহিত স্বচ্ছ রজতধারা। “শাবনাম” মসলিনের অর্থ ভোরের শিশির। মলমর
খাস, মলবুস খাস, আঁবে-ই-রওয়া, শবনাম,ঝুনা, বদনখাস, আলিবালি, শর-বন্দ, শরবেত হরেক পদের মসলিন তৈরীতে মুসলিম কারিগরদের সুনাম ছিল। শুধু মসলিন বয়ন শিল্প-ই নয়, মসলিন কাপড়কে শিল্পীত করতে সোনা রূপার কারুকাজ ও রঙ করা হত।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁও কে ঘিরে গড়ে উঠেছিল মসলিন শিল্পের পল্লী। মসলিন কাপড় এতই মসৃন ছিল যে একটি শাড়ি ছোট একটি ম্যাচের বাক্সে রাখা যেত এবং একটি আংটির ভিতর দিয়ে পার করা যেত ১৪ হাত মসলিন শাড়ি। সুতাতে রঙ করা, নকশা করা,রিফু করা ইত্যাদি কাজের জন্য সোনারগাঁও ছিল বিখ্যাত। বিশেষত মলমল খাস ও মলবুস খাস ছিল দিল্লীর সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীদের জন্য। “সরকার-ই-আলী” মসলিন ছিল
মুর্শিদাবাদের নবাব ও নায়েব নাজিমদের জন্য। মসলিনে যত বেশী সুতা থাকত অথচ ওজনে হালকা সে মসলিন তত বেশী জনপ্রিয় ছিল। সম্রাট আরঙ্গজেবকে একখন্ড মসলিন কাপড় পাঠানো হয়েছিল যার ওজন ছিল ৭ তোলা এবং মূল্য ছিল তখনকার ৪০০ টাকা। সুবেদার ইসলাম খান দিল্লীর সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং সম্রাজ্ঞী নূরজাহানকে সোনারগাঁওয়ের খাস নগরে তৈরী বিশ হাজার টাকা মূল্যমানের মসলিন কাপড় উপহার
পাঠিয়েছিলেন। অধিকাংশ মসলিন কাপড়ের ওজন-ই সাত তোলা থেকে বিশ তোলার বেশী হয় না।
মসলিনের সহোদর জামদানিও ছিল অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। সম্ভবত মুসলমানরাই জামদানির প্রচলন করে এবং দীর্ঘদিন যাবত্ একচেটিয়াভাবে এটি মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মসৃন কাপড় থেকে মসলিন আর এই মসলিনের বিকল্প হিসেবেই নতুনভাবে আসে জামদানি। যদিও আগে মসলিনের উপর জ্যামেতিক বুটিক কাজ-ই জামদানি কাপড় বলে পরিচিত ছিল। তবে ইদানিং এই জামদানি নকশার সাথে সাথে কাপড়েরও পরিবর্তন হয়।
মসলিন বিলোপ হয়ে গেলেও গর্বের জামদানি টিকে আছে আজ অবধি। তবে মসলিন শিল্পের সমসাময়িক সময়ে যে জামদানি ছিল আজ তা নেই বললেই চলে।
এখন শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া জামদানি কাপড়ের বুনন দেখা যায় না। আর প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা পায় না বলে কমছে তাঁতীদের সংখ্যাও। বিলোপ হতে চলেছে তাঁত শিল্প। টিকে থাকা জামদানি মসলিনের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেস্টা করলেও কালের গহ্বরে এ কাপড়ও যে হারিয়ে যাবে না তা কে বলতে পারে? তাই জামদানি শিল্প ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী পদক্ষেপ এবং মসলিনকে ফিরিয়ে আনার
পরিকল্পনা। বাংলার ঐতিহ্যকে পুঁজি করে ভারত এগিয়ে গেছে অনেকখানি তবে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে ভারতের-ই পাশের একটি দেশ হয়ে।

YOUR NAMEAbout Me
আসসালামু আলাইকুম। নবীন বাংলা ব্লগ সাইটে ভিজিট করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আসলে এই ব্লগ সাইটটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। এবং আমি এই সাইটের এডমিন, মূলত ব্লগিং প্রাকটিস এবং মুক্ত জ্ঞাণ চর্চার জন্যই এই সাইটটি ওপেন করেছি। আমার সাইটের পোস্টগুলো অন্যান্য সুনাম খ্যাত ব্লগ সাইটে সমূহে পাবলিশ করে থাকি তথারুপ টেকটিউন্স, টিউনারপেইজ। ইনশাআল্লাহ যতদিন বেঁচে থাকব নবীন বাংলা ব্লগে লেখালেখি করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এখানে অন্যান্য লেখকদের বাছাই করা পোস্টগুলো পাবলিশ করা হয়। এবং ইচ্ছা করলে আপনিও এই ব্লগের অতিথি লেখক হিসাবে শুরু করতে পারেন।পরিশেষে আমার সাইট কিংবা প্রকাশিত লেখা সম্পর্কে কোন আপনাদের অভিযোগ, মতামত, পরামর্শ থাকলে তা সাদরে গ্রহন করা হবে। আবারো ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা সবাইকে!!
Follow : | | Facebook | Twitter

Post a Comment

 
Top