0
পালাজ্জো রেজ্জোর ভেতরে। অসংখ্য ফ্রেস্কো সমৃদ্ধ এই বিশালাকার ঘরে একটি দানবাকৃতির ঘোড়া অতীতকে জানান দিয়ে যাচ্ছে যেন।

একদিকে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, আরেকদিকে পো আর আদিজে নদী, এই দুটো নদী ছাড়াও আরও পাঁচটি নদী কুলকুল ধ্বনিতে প্রবাহিত হয়ে চলেছে ইটালির ভেনেতো রাজ্যের চারপাশ দিয়ে। আল্পস পর্বত থেকে উৎসরিত হয়ে গারদা লেক এই রাজ্যের মহিমা বাড়িয়েছে যেন অনন্ত কাল ধরে। মাঝখানে সাগর এবং নদীর সংযোগ স্থলে জেগে উঠেছে লেগুন। সেই লেগুনের ধারেই তিলোত্তমা ভেনিস নগরী। ভেনিসের এই শৌর্য বীর্যের বহুকাল আগেও মনুষ্য বসতির ইতিহাস রয়েছে এই অঞ্চলে যা রচিত হয়েছে পো ভ্যালিতে। খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে, মুলত বর্তমান রোভিগো শহরের ধার ঘেঁসে যে জনবসতি গড়ে উঠেছিল তা ছিল এতদঞ্চলের বানিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। জলের লোভে লোভে মানুষের আগমন, মানুষের বসতি, মানুষের সংযোগ আর বানিজ্যের সূত্রপাত আর সেখান থেকে এই ভেনেতো রাজ্য কালক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইউরোপের বানিজ্যের পীঠস্থান হিসেবে। সাগরের মধ্যে দিয়ে অন্যান্য মহাদেশ, নদীর ভেতর দিয়ে ইটালির অন্যান্য রাজ্যের সাথে এই অঞ্চলের গড়ে উঠেছে এক বহুমুখী সম্পর্ক। দীর্ঘ এক হাজার বছর এই ভেনেতো রাজ্য ছিল একটি স্বাধীন রিপাবলিক। অ্যাড্রিয়াটিক সাগর পারি দিলেই ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পারের দেশ। সেইসব দেশের মানুষরা সাগরের এপার ওপার বানিজ্য বসতি করেছে সে অতি প্রাচীনকাল থেকে। আবার বাণিজ্য নগরী হিসেবে সুনাম গড়ে ওঠার পরপরই সিল্ক রুটের মাধ্যমে সুদূর এশিয়া মহাদেশ থেকেও সওদা নিয়ে হাজির হয়েছে নানান রঙের বণিকেরা। এশিয়া থেকে এসেছে মশলা ও সিল্ক, অ্যাড্রিয়াটিকের পূর্ব পার থেকে এসেছে রঙিন গ্লাস, গ্রিস থেকে এসেছে সিরামিক, আর বিনিময়ে এখান থেকে গেছে প্রসেসকৃত মেটাল, উল, লবন এবং শক্ত পোক্ত ঘোড়া। আর এই বিনিময়ে বিপুল লাভ ও উদ্বৃত্ত হয়েছে এই রাজ্যের। শুধু বিনিময়ের মাধ্যমে উপার্জন নয়, এখানে বনিকেরা এইসব পন্যের স্থানীয় বাজার নির্মাণে অগ্রণী হয়েছে, কারখানা গড়ে তুলেছে নানান সামগ্রীর।এইসব কারখানায় স্থানীয় কারিগররা নির্মাণ করেছেন সমৃদ্ধ কাঁচ শিল্প, বালটিক অ্যাম্বার এর নয়ন মনোহর গয়না, ব্রোঞ্জের থালা বাসন, মেয়েদের মাথার চিরুনি থেকে শুরু করে নানান নিত্য ব্যাবহার্য সামগ্রী। তাঁদের তৈরি এইসব অপূর্ব নির্মাণ কর্মের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুরে। তবে এই ভেনেতো রাজ্যের লক্ষীর শহর ভেনিস হলেও সরস্বতী কিন্তু বাস করেন অন্য আরেক শহরে, নাম তার পাদুয়া। বাকিলিয়নে নদীর ধারে গড়ে ওঠা ইটালির আরেক প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ নগরী।
এই সরস্বতীর দেখা মিলেছে ১২২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে। বোলোনিয়ার পরে এটি ইটালির দ্বিতীয় প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। এই সেই বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে গ্যালিলিও গ্যালিলেই দীর্ঘ আঠারো বছর শিক্ষকতা করেছেন এবং স্বীকার করেছেন যে এটিই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়! এখান থেকেই কোপার্নিকাস পেয়েছেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত ডক্টরেট ডিগ্রি। তাছাড়া ভেনিসের নিকটবর্তী হওয়ায় যাতায়াত ব্যাবস্থা ভালো হবার কারণে প্রচুর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর পাঠের সুযোগ মিলেছে এখানে।
শিল্পকলায় এই শহর ইটালিতে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। তাঁর কারণ হলেন জত্তো। জত্তো হলেন রেনেসাঁর শুরুর দিকের অর্থাৎ চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকে ইটালির শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী। ফ্লোরেন্স মিউনিসিপালিটির বেতনভুক্ত শিল্পী ছিলেন তিনি। গোটা ইটালি জোরা তাঁর সুনাম। ফ্রেস্কোর মাধ্যমে বিভিন্ন গির্জার দেয়াল এবং সিলিঙে তাঁর ছবি থাকা মানে গির্জার সুনাম বেড়ে যাওয়া। ফ্লোরেন্সের দুয়োমোর বেল টাওয়ারের নকশা করেছেন তিনি। আবার আসিসিতে অবস্থিত অনবদ্য সেন্ট ফ্রাঞ্চিসকো গির্জার ফ্রেস্কো এঁকেছেন তিনি। যদিও ফ্রাঞ্চিসি গির্জার ছবিগুলি তাঁর আঁকা কিনা এনিয়ে সংশয় আজো কাটেনি।
তবে উনার মাস্টারপিসটি রয়েছে এই পাদুয়া শহরে। পাদুয়ার বিত্তবান বনিক জনাব স্করভিয়েনি মশাই শিল্পের ভক্ত মানুষ। তাঁর শহরে রোমান এম্পিথিয়েটার ভগ্নপ্রায়। তাঁর পাশেই রয়েছে অপরূপা বাগান। অনেকদিন থেকেই পুরো জায়গাটি কিনতে চান তিনি। সামর্থ্য হওয়া মাত্রই পুরো জায়গাটি কিনে এখানে একটি গির্জা নির্মাণে ব্রতী হয়ে ওঠেন, সাথে চাই এমন একটি চ্যাপেল যা কিনা শিল্পকলায় পরিপূর্ণ থাকবে। ডাক পড়ল ইটালির শ্রেষ্ঠ ফ্রেস্কো শিল্পী জত্তোর। কমিশন ছিল অঢেল। জত্তো আঁকালেন তাঁর মনের মত করে। পুরো চ্যাপেলের সিলিং ডুবিয়ে দিলেন নীল রঙ দিয়ে যেন তা রাতের জ্যোৎস্না ভরা আকাশ, তাঁর মাঝ দিয়ে উঁকি দিচ্ছেন যীশু। আর দেয়াল ভরিয়ে দিয়েছেন একের পর এক অনন্য সব মাস্টার পিস দিয়ে। সেখানে রয়েছে যিশুর গল্প, যিশুর বেড়ে ওঠা, যিশুর মৃত্যু, এছাড়াও আছে স্বর্গ এবং নরকের গল্প। এক একটি ক্যানভাস যেন এক একটি মাস্টারপিস।। এমনই দ্যুতি, এমনই সেগুলির বৈভব, এমনই তাঁর সৌন্দর্য। এমনকি একটি ক্যানভাসে একটি নারী ও পুরুষকে চুম্বনরত অবস্থায়ও দেখা গেছে। আর এটাই নাকি চুম্বনের প্রথম শিল্পরূপ। এই স্কারভিয়েনি চ্যাপেল এর আর্ট কর্ম শেষ হলে ইটালি জুরে হৈচৈ পরে যায়। কেননা এত অপূর্ব এবং নিখুঁত সব ফিগারেটিভ আর্ট ছিল সেই জামানায় অভূতপূর্ব। এই আর্টের খবর ইউরোপ জুরে ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগেনি। এই চ্যাপেল জত্তোকে দিয়েছে অমরত্ব আর পাদুয়া শহরকে দিয়েছে আর্টের ক্ষেত্রে একটি অমুল্য স্থান। এটি রেনেসাঁসের শুরুর দিকের একটি শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে।
এই পাদুয়া শহরে রয়েছে ইউরোপের দীর্ঘতম উদ্যান প্রাতো দেল্লা ভাল্লে। এই গোলাকার আকৃতির শুন্য উদ্যানটি এক সময় ছিল রোমান থিয়েটার। এখন শহরবাসীর রিল্যাক্সেশনের অন্যতম জায়গা। ৭৮ টি বিখ্যাত ব্যাক্তিবর্গের মুর্তি সম্মিলিত উদ্যানের চারপাশ জুরে আছে পাদুয়ার প্রাচীন সব প্রাসাদ। এই উদ্যানের অনতিদূরেই রয়েছে এই শহরের আরেক জুয়েল, বাসিলিকা সেন্ট অ্যান্থনি যার আরেক নাম বাসিলিকা ইল সান্তো। সান্তোর মৃত্যুর পর ১২৩১ সালে এই গির্জার নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এটি বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টানদের একটি অন্যতম তির্থস্থান। এখানে সান্তোর কবর সহ তাঁর ব্যাবহৃত কিছু সামগ্রী রয়েছে। আর রয়েছে অসাধারণ সব চিত্রকর্ম। আর এই গির্জার ঠিক বাইরে রয়েছে দোনাতেল্লোর একটি ভাস্কর্য যা তাঁর অন্যতম মাস্টারপিস হিসেবে স্বীকৃত।
১) ১৩০৫ সালে নির্মিত স্করভিয়েনি চ্যাপেল বাইরে থেকে দেখলে নেহাত সাদাসিধে, ছোটখাটো এক গির্জার মতন মনে হয়।
DSC_6988
২) তবে ভেতরে আছে অমুল্য সব পেইন্টিং। জত্তোর মাস্টারপিস।
DSC_6793
৩) প্রাতো দেল্লা ভাল্লে। ইউরোপের বৃহত্তম উদ্যান।
DSC_6905
৪) অপূর্ব বাসিলিকা ইল সান্তো। ইউরোপে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের এক পীঠস্থান।
DSC_6921
৫) বাসিলিকার বাইরে অবস্থিত দোনাতেল্লোর ব্রোঞ্জের ঘোড়সওয়ার।
DSC_6920
৬) পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়
DSC_6924
৭) পাদুয়ার দুয়োমো। এই দুয়োমোর নকশা আঁকায় সহযোগিতা করেছিলেন খোদ মিকেলএঞ্জেলো।
DSC_6900
৮) পালাজ্জো দেল রেজ্জো। বাইরে খোলা মার্কেট।
DSC_6826
৯) দক্ষিণ কোরিয়ার এক শিল্পীর ভাস্কর্য প্রদর্শনী চলছে গোটা শহরে।
DSC_6778
১০) দোকানে কিউপিড।
DSC_6899
১১) অলঙ্কারের দোকানে সোনার জলহস্তী!
DSC_6965
১২) খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর পূর্বে ব্যাবহৃত রমণীদের মাথার ক্লিপ।
DSC_6838
১৩) এরেমিতানি গির্জার ভেতরে
DSC_6805
১৪) দান্তে সাহেব এমন রেগে রয়েছেন কেন?
DSC_6903
১৫) নগ্নিকা
DSC_6977
১৬) বুদ্বুদ বেলুন
DSC_6974
১৭) একটি গির্জার সিলিং
DSC_6917
১৮) ১৮৩১ সালে নির্মিত ক্যাফে পেরদক্কি।
DSC_6928
১৯) রোমান প্লেট।
DSC_6799
২০) পালাজ্জো দেল রেজ্জোর অপূর্ব বারান্দা। বারান্দায় ফটো সেশন।
DSC_6891
২১) ব্রোঞ্জের তৈরি প্রাচীন ক্ষুদ্রাকৃতির মূর্তি।
DSC_6858
২২) স্করভিয়েনি চ্যাপেলে অবস্থিত অনেকগুলি চিত্রকর্মের মধ্যে একটি। ছবিটি নেট থেকে সংগৃহীত।
646px-Giotto_di_Bondone_009

YOUR NAMEAbout Me
আসসালামু আলাইকুম। নবীন বাংলা ব্লগ সাইটে ভিজিট করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। আসলে এই ব্লগ সাইটটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। এবং আমি এই সাইটের এডমিন, মূলত ব্লগিং প্রাকটিস এবং মুক্ত জ্ঞাণ চর্চার জন্যই এই সাইটটি ওপেন করেছি। আমার সাইটের পোস্টগুলো অন্যান্য সুনাম খ্যাত ব্লগ সাইটে সমূহে পাবলিশ করে থাকি তথারুপ টেকটিউন্স, টিউনারপেইজ। ইনশাআল্লাহ যতদিন বেঁচে থাকব নবীন বাংলা ব্লগে লেখালেখি করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এখানে অন্যান্য লেখকদের বাছাই করা পোস্টগুলো পাবলিশ করা হয়। এবং ইচ্ছা করলে আপনিও এই ব্লগের অতিথি লেখক হিসাবে শুরু করতে পারেন।পরিশেষে আমার সাইট কিংবা প্রকাশিত লেখা সম্পর্কে কোন আপনাদের অভিযোগ, মতামত, পরামর্শ থাকলে তা সাদরে গ্রহন করা হবে। আবারো ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা সবাইকে!!
Follow : | | Facebook | Twitter

Post a Comment

 
Top