১৯৭০ সালে নির্মিত ও মুক্তিপ্রাপ্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা চলচ্চিত্রে যে ছবিটি পুরো পাকিস্তান কাঁপিয়ে দিয়েছিল তার নাম ‘জীবন থেকে নেয়া’ । ছবিটির পরিচালক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অগ্নিপুরুষ জহির রায়হান । ‘জীবন থেকে নেয়া’ শুধুই একটি পারিবারিক ড্রামা নির্ভর একটি সাধারন ব্যবসাসফল বাণিজ্যিক ছবি নয়। ‘জীবন থেকে নেয়া’ হলো একটি পরাধীন দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া একটি ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল
। ‘জীবন থেকে নেয়া’ হলো একটি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে নিষ্পেষিত জনতার জেগে উঠার প্রতিচ্ছবি। ‘জীবন থেকে নেয়া’ হলো একটি দেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের পটভূমির জলজ্যান্ত চিত্র। তাইতো সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা বাংলা ছবির একটি জহির রায়হান এর ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি। আমি ছবিটি সম্পর্কে আজ কোন আলোচনা করবো না। কারন এই ছবি দেখে বহুজন বহুবার তাঁদের বিস্লেশন ও ভালো লাগা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আজ আমি ছবিটি তৈরি করার পেছনের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করবো । কারন সবাইকে জানতে হবে কি কারনে ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি তৈরি করেছিলেন জহির রায়হান এবং কিভাবে তা হয়ে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়।।
১৯৭০ সালের মধ্য জানুয়ারিতে জহির রায়হান তাঁর বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত ছবিটি নির্মাণ শুরু করেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। এই সময়টাকেই জহির রায়হান বেছে নেন ছবিটির কাজ শুরু করার। প্রথমে সিদ্ধান্ত নেন যে জহির তাঁর লিখা কাহিনী নিয়ে শুধু ছবিটি প্রযোজনা করবেন আর পরিচালনা করবেন নুরুল হক বাচ্চু। ছবিটির নাম রাখা হয় ‘তিনজন মেয়ে ও এক পেয়ালা বিষ’ ,কিন্তু সপ্তাহ খানেক পরেই ছবির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জীবন থেকে নেয়া’ আর জহির শুধু প্রযোজক নয় পরিচালনাও করবেন। গল্পের বিভিন্ন চরিত্র ছিল তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনার এক একটি রুপক চরিত্র যেখানে আনোয়ার হোসেন সেই সময়ের জনপ্রিয় কোন রাজনৈতিক নেতার প্রতিনিধিত্বকারী, রাজ্জাক এর ছাত্রনেতা ফারুক চরিত্রটি প্রতিবাদী ছাত্রনেতার প্রতিনিধি, মহুরি খান আতাউর রহমান স্বাধীন চেতনার পরিচায়ক, উগ্রচণ্ডী , দজ্জাল রওশন জামিল একনায়কতন্ত্র স্বৈরশাসক আইয়ুব/ ইয়াহিয়ার রুপক চরিত্র। সেই সময়ের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরীতে শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার দৃশটি সরাসরি ২১ এর প্রভাত ফেরিতেই চিত্রায়ন করা হয় যেখানে সারিবেধে খালি পায়ে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়া সবই ছিল বাস্তব এর সেই ১৯৭০ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে নেয়া। ছবির কাহিনীটি সাজানো হয় উগ্রচণ্ডী দজ্জাল বড় বোন
রওশন জামিল এর নির্যাতনে স্বামী খান আতাউর রহমান নিষ্পেষিত , দুই ভাই শওকত আকবর ও রাজ্জাক ,দুই ভাইয়ের দুই বধু রোজী ও সুচন্দা এবং বাড়ীর চাকর বাকর ও রোজী –সুচন্দার বড় ভাই জনপ্রিয় দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেন কে নিয়ে ।
রওশন জামিল এর নির্যাতনে স্বামী খান আতাউর রহমান নিষ্পেষিত , দুই ভাই শওকত আকবর ও রাজ্জাক ,দুই ভাইয়ের দুই বধু রোজী ও সুচন্দা এবং বাড়ীর চাকর বাকর ও রোজী –সুচন্দার বড় ভাই জনপ্রিয় দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেন কে নিয়ে ।
পুরো বাড়ীতে দজ্জাল বড় বোন রওশন জামিল এর একচ্ছত্র আধিপত্য চলতে থাকা অবস্থায় দুই ভাই বিয়ে করে নববধুদের সংসারে প্রবেশ এবং পরবর্তীতে সংসারের চাবির ঘোছা নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখার কূটকৌশল চরমে পৌঁছে যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ইয়াহিয়া/ আইয়ুব খানের শোষণ ও ক্ষমতা থাকার কূট কৌশলের রুপক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন জহির রায়হান। অন্যদিকে আনোয়ার হোসেন ও রাজ্জাক এর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষ্পেষিত বাঙ্গালীর আন্দোলন সংগ্রাম জেল জুলুম এর বাস্তব চিত্র ছিল ছবিটিতে। আনোয়ার হোসেন ও রাজ্জাক এর জেলের ভেতর থাকা অবস্থায় নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটি ব্যবহার করে মুলত আন্দোলনে থাকা বাঙ্গালিদের উৎসাহ যোগান দেয়ার চিত্র। নবজাতক এর নাম ‘মুক্তি’ রুপক অর্থে স্বাধীন বাংলাদেশ এর জন্ম ও শোষকের হাত থেকে মুক্তির বহিঃপ্রকাশ। ছাত্রনেতা ইকবালের গ্রেফতার হয়ে কারাগারে প্রবেশ এর সময় উচ্চারিত রবীন্দ্রনাথ এর ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী’ ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ার উৎসাহের তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত যার সবই ছিল জহির রায়হান এর দূরদর্শী সৃষ্টি।
এভাবেই ঝির রায়হান ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটির প্রতিটি ফ্রেমে ফ্রেমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। যার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ছবিতে জহির রায়হান এর ব্যবহৃত রবীন্দ্রনাথ এর কবিতাটি স্বাধীন বাংলাদেশের ‘স্মৃতিসৌধ’ স্থান পেয়ে বাঙ্গালীর চির প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি যে স্বাধীন বাংলাদেশের ইঙ্গিত বহন করছে তা বিগ্রেডিয়ার রাও ফরমান আলী , মেজর মালেক ও তাঁদের এদেশীয় দোসররা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তাঁরা ছবিটিকে সেন্সর ছাড়পত্র না দেয়ার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু দেশপ্রেমিক সচেতন দর্শকদের মিছিল, স্লোগান ও দাবির মুখে সামরিক সরকার বাধ্য হয়েছিল এ ছবির ছাড়পত্র দিতে। নির্ধারিত তারিখের এক দিন পর অর্থাৎ ১৯৭০ সালের ১১ এপ্রিল। শেষ পর্যন্ত জীবন থেকে নেয়া ‘ ছবিটি মুক্তি দেন জহির রায়হান । ছবিটি মুক্তি দেয়ার ফলে ষড়যন্ত্রকারীরা হয়েছিল পরাজিত আর জনতাই হয়েছিল জয়ী। জীবন থেকে নেয়ার মাধ্যমে এভাবেই তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় আর বাংলা চলচ্চিত্র পেয়েছিল এক অসাধারন কালজয়ী ছবি।।

Post a Comment